উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি:১০৮ জনের মৃত্যু

93

রংপুর বার্তা.কম:দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানের অংশে কুড়িগ্রাম, রংপুরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জে অবনতি হয়েছে। কয়েকটি নদী রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এদিকে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করেছে।অন্যদিকে পর্যন্ত বন্যায় ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চলের বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করার আশংকা রয়েছে। এছাড়া গঙ্গা-পদ্মার পানি বৃদ্ধি আগামী ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকবে। এই অববাহিকার উজানে নেপালে ও বিহারে বন্যার কারণে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৗশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দেশের উজানের তিনটি অববাহিকার মধ্যে গঙ্গায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে, ব্রহ্মপুত্রের উজানের তিনটি পয়েন্টে (গোহাটি, পান্ডু,গোয়ালপাড়া) পানি  হ্রাস পাচ্ছে,  ধুবরী পয়েন্ট পানি  স্থিতিশীল রয়েছে। অপরদিকে  মেঘনা অববাহিকায় পানি হ্রাস অব্যাহত আছে। ব্রহ্মপুত্রের কুড়িগ্রামের নুনখাওয়া ও চিলমারী পয়েণ্টে পানি হ্রাস পেয়েছে, সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জ, আরিচা পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে । মধ্যাঞ্চলের ঢাকার চতুর্দিকের ৫টি নদীর পানি বিপদসীমার ৩৮ সে.মি হতে ১৩৬ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গতকাল পর্যন্ত বন্যায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এর মধ্য গত ৪৮ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ২১ জেলায় ১ হাজার ৮২৪টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও পানি শোধনের বড়ি মজুত আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিবের দায়িত্বে থাকা মো. গোলাম মোস্তফা গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকের জানান, এখন পর্যন্ত বন্যায় দেশের ২১ জেলায় ৩২ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ হেক্টর।  তিনি বলেন, ১ হাজার ৫৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ লাখ ১১ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ত্রাণ পেতে কারও যদি কোনো অসুবিধা হয়, তাহলে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশি­ষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী ( ৪৪-৮৮ মি.মি) থেকে অতি ভারী ( ৮৯ মি.মি বা অধিক) বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ী এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

সিরাজগঞ্জ: গতকাল ২০ সে.মি বৃদ্ধি পেয়ে  বিপদ সীমার ১৫০  সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনার পানি। কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালি, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার আড়াই শতাধিক  গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে । বেলকুচি, চৌহালি, শাহজাদপুরের দুই লাখ মানুষ সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শাহজাদপুরে যমুনা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান,  যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যহত রয়েছে যা অতীতের  রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ।

মানিকগঞ্জ: শিবালয় উপজেলার আরিচাঘাট এলাকায় বুধবার সকালে বিপদসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। ফলে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

শেরপুর: জেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে সদর উপজেলার ২৫ গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। চর পক্ষীমারীর বেপারী পাড়ার কয়েকটি বাড়ি বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গেছে।

বগুড়া: সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গতকাল যমুনার পানি বিপদ সীমার ১২৬ সে.মি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ কারণে বাঁধের ওপরে আশ্রয় নেওয়া জনতাকে বাঁধ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

রাজবাড়ী: গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদ সীমার ৭৬ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১৬ হাজার পরিবার।

নীলফামারী: তিস্তা শান্ত হলেও ত্রাণের জন্য বানভাসীদের হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকটের সাথে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। গতকাল আরো ৫টিসহ মোট ৬৫টি পরিবারের বসতভিটা তিস্তা গর্ভে বিলীন হয়েছে। গতকাল দুই শিশু বানের পানিতে ডুবে মারা গেছে।

লালমনিরহাট: তিস্তার পানি হ্রাস পেলেও ধরলা নদীর পানি বিপদ সীমার ৭৫ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ৫টি উপজেলায় ১ লাখ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে।  এ পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। লালমনিরহাট-বুড়িমারী লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

কুড়িগ্রাম: গতকাল ধরলার পানি বিপদসীমার ৭৭ সে.মি ও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৮০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলার অভ্যন্তরিণ রুটের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। বন্ধ রয়েছে রেল যোগাযোগ। পানিবন্দী ৯ উপজেলার ৮২০ গ্রামের ৪ লাখ মানুষের অধিকাংশই পায়নি ত্রাণ। ৪২ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার মানুষ।

নওগাঁ: জেলার ১১টি উপজেলার মধ্যে ৮টি উপজেলার ৩ লক্ষাধিক লোক পানিবন্দী। রানীনগর মান্দা ও আত্রাই উপজেলার ১৫টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বেরী বাঁধ ভেঙে বিস্তৃর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এক লাখ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে ও কয়েক হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গতকাল সাপাহারে পূর্ণভবা নদীর বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার লোক পানি বন্দী হয়েছে। আত্রাই নদীর মহাদেবপুর পয়েন্টে বিপদসীমার ২৩০ সে.মি, পত্নীতলায় ২২০ সে.মি, মান্দায় ১২০ সে.মি, ধামইরহাটে ২১১ সে.মি, উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় দুই লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জয়পুরহাট: জেলায় ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে তুলশীগঙ্গা নদীর পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আক্কেলপুরে মাদারতলীঘাট বাঁধ ধসে যাওয়ায় তা স্বেচ্ছাশ্রমে রক্ষা করার চেষ্টা করছে মানুষ।  প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধান তলিয়ে গেছে।

রংপুর: জেলায় বন্যা কবলিত এলাকায় খাদ্য ও পানির তীব্র সংকট দেখো দিয়েছে। বদরগঞ্জে ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলে প্রায় ১ লাখ পরিবার পানিবন্দি। তিস্তার পানি কমায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ সাড়ে ৪’শ ঘরবাড়ি। বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে পীরগঞ্জের শিবদেব সরকারি প্রাধমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন। জেলায় ২৫০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ।

জামালপুর: যমুনার বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ১৩৩ সে.মি. উপর দিয়ে (স্থিতিশীল) প্রবাহিত হচ্ছে। ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় ছয় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। বন্যাজনিত কারণে চারজনের মৃত্যু ও দুজন নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজরা হলো- মেলান্দহ ময়না শেখের পুত্র সজিব (১৬) ও জামালপুর সদর উপজেলার লাল মিয়া (৪২)। নিহতরা হলো- মেলান্দহের জিল্লুর রহমান শান্ত (১৬) ও আজিবর মোল্লা (৩২), বকশিগঞ্জের মোজাম্মেল হক (৪০) ও ইলিয়াছ গাজী (১৬)।  জেলায় ৯৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

নেত্রকোনা: গত মঙ্গলবার জেলার কলমাকান্দায়  বন্যার পানিতে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হচ্ছেন- শত বত্সরের বৃদ্ধ মকবুল হোসেন ও মন্ডলেরগাতী গ্রামের জামাল মিয়া (৫০)। জেলা সদরের সাথে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

টাঙ্গাইল: গতকাল বুধবার ভূঞাপুরে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ১৪০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।  তারাকান্দি-ভূঞাপুর সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের সদর উপজেলার পাছবেথৈর এলাকার কিছু অংশ পানির তোরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর উপজেলার নওগাঁ গ্রামে গতকাল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেছে।

সিলেট: জেলার সর্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তীত। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবজারে কয়েক লাখ লোক পানিবন্দী। উজানের পানি নিচু এলাকায় নেমে গ্রামাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে।

গাইবান্ধা: বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে নতুন করে সাঘাটা, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জের আরো অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভাসহ সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ ও সদর উপজেলার ৪২টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ এখনও পানিবন্দি। আর পানিতে ডুবে মঙ্গলবার রাতে মারা গেছে এক শিশু।

দিনাজপুর: বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তীত রয়েছে। কিছু কিছু এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। জেলার ১১ উপজেলায় পাঁচ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী রয়েছে। রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল চারজনসহ এ পর্যন্ত বন্যাজনিত কারণে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরা হলেন- সদর উপজেলার হুমায়ুন (১৬), বিরলের মালিয়া মুড়মু (৫৯), মাসুর রহমান (১৫), পার্বতীপুরের আতাবুর রহমান (৫৫)।

বেড়া (পাবনা): উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের চার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

রাজবাড়ী: গোয়ালন্দ দৌলতদিয়া গেজ স্টেশন পয়েন্টে পদ্মানদীর পানি বিপদসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অস্বাভাবিক হারে এ পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার অনেক নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চাল প্লাবিত হতে শুরু করেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় পদ্মার পানি ২৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে ওই এলাকার অসংখ্য মানুষ। পানিতে অনেক ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।