১৯৭১ সালের ৭ মার্চ:ড. এম এ মাননান

17

রংপুর বার্তা.কম;১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। মাত্র ১৪ দিন আগে গিয়েছিলাম একুশের প্রভাতফেরিতে; অরুণোদয়ের একটু আগে কয়েক গোছা ফুল হাতে নিয়ে, শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রেসকোর্স ময়দানের পাশ দিয়ে বর্ধমান হাউস (বাংলা একাডেমি) পার হয়ে মেডিকেল কলেজের উত্তর দিকের প্রান্ত দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

প্রভাতফেরির আমেজের মতো, তবে একটু ভিন্ন রকমের শিহরণ নিয়ে গিয়েছিলাম রেসকোর্স ময়দানে; সেদিন যে দিনটি তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতির সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছিল। বন্ধুবান্ধব নিয়ে হাজির হয়েছিলাম রেসকোর্স ময়দানে, বক্তব্য শুনতে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের; যার পরিচিতি সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কাছে শুধুই ‘মুজিব ভাই’। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র।

সামনে মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য সমাপনী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সময়টা ছিল এমন, যখন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়াবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। মাত্র ১৫-১৬ মাস আগে ১৯৬৯-এ জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন গণআন্দোলনের মুখে। সত্তরের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় অর্জন করা সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে।

১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেয়ার জন্য মেজরিটি দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানকে অনুরোধ করার পরও অধিবেশনের তারিখ না দিয়ে মাইনরিটি দলের নেতা ভুট্টোর কথা অনুযায়ী তিনি হঠাৎ ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দেন। ইতিমধ্যে কসাই নামে পরিচিত টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়।

তিন দিন পর ৫ মার্চ ঢাকার রাজপথ আবারও রক্তরঞ্জিত হয়, চট্টগ্রামেই শুধু ২৩৮ জন নিহত হন, টঙ্গীতে নিহত হন এক শ্রমিক। সব মিলিয়ে বিক্ষোভে উত্তাল সারা বাংলা, ক্ষোভে-দুঃখে প্রতিবাদমুখর। স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনসহ স্বাধীনতার শপথগ্রহণ করা হয় শহীদ মিনারে ড. আহমদ শরীফের নেতৃত্বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিমিছিল বের করে রাজধানীর সড়কে।

এমন এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে ৭ মার্চ বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে বাঙালির প্রাণপুরুষ শুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরিহিত (যা মুজিব কোট নামে বিখ্যাত হয়ে উঠে) বঙ্গবন্ধু সেদিন রেসকোর্স ময়দানে এলেন, দৃপ্তপায়ে মঞ্চে উঠলেন, ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে চারদিকে হাত নেড়ে সবাইকে অভিবাদন জানালেন। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-কাঁপানো জয় বাংলা স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে শুরু করলেন তার অমিয় ভাষণ।

আমার হলের বন্ধুরাসহ একেবারে মঞ্চের সামনে বাঁশের ঘের দেয়া সীমানার পাশেই বসা ছিলাম। তাই মঞ্চটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখলাম, হাত নাড়া শেষ হতে না হতেই বক্তব্য শুরু করলেন তিনি। টানা আঠারো মিনিট বক্তব্য রাখলেন কোনো কিছু না দেখেই। এরই মধ্যে মাথার ওপর দিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টার চক্কর দিয়ে গেল। এ সময় সারা ময়দানের জনসমুদ্রে শুরু হল গগনবিদারী জয় বাংলা স্লোগান। মানুষের সমুদ্রে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারল না সে হেলিকপ্টার।

উল্টো মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়ল বাঁশের লাঠি হাতে সমবেত লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ মানুষ। হেলিকপ্টারটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। জিমখানা বরাবর (চারুকলা ইন্সটিটিউটের সামনে) রাস্তায় উঠে দেখি সারা রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ, প্রায় প্রত্যেকের হাতে তিন-চার ফুটের লাঠি। সেদিন ঢাকা ছিল মিছিলের শহর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন।

একটি জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টির সহায়ক, স্বাধীনতার স্বপ্নের বাস্তবায়নে মহা আলোড়নকারী হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৭ মার্চের ভাষণকে কেউ কেউ বলেছেন ‘স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণের মহাকাব্য’। দীর্ঘদিনের নিপীড়িত বাঙালিকে সশস্ত্র করে তুলেছিল এ ভাষণ। শ্রদ্ধার সঙ্গে বরিত হয়েছে এ ভাষণ দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলে। তফসিল আকারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে।

এগারশ’ পাঁচ শব্দবিশিষ্ট এত ছোট ভাষণটি নিয়ে কেন বিশ্বব্যাপী এত উৎসাহ? তার মূল কারণ যা আমার মনে হয় : ভাষণটি ছিল অলিখিত হলেও প্রাঞ্জল-স্বতঃস্ফূর্ত, বক্তব্যের মোহনীয়তায় অসাধারণ, মাধুর্যমণ্ডিত বাচনভঙ্গি আর বাক্যবিন্যাসের কারণে কাব্যময়, হৃদয় থেকে উৎসারিত আমজনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, সব নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির জন্য প্রেরণাদায়ক, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আলোকবর্তিকাস্বরূপ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ইঙ্গিতবহ।

তিনি যখন তার ভাষণে বলেন : ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’, তখন বোঝা যায় তিনি নিজের কথা বলছেন না, বলছেন সবার কথা, সবার মুক্তি আর অধিকার আদায়ের কথা। ভাষণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে পরাধীন; তাই তাদের প্রয়োজন এ রকম পরাধীনতা থেকে মুক্তি।

এ বিষয়টি বাক্সময় হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেন : ‘এ দেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’। তিনি এ ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন, শাসকদের সব দাবিই মানতে হবে (দাবিগুলো ৬ দফার মধ্যেই নিহিত ছিল)। চারটি শর্তের মধ্যে বেঁধে ফেললেন শাসকদের : ১. সামরিক আইন উঠিয়ে নেয়া; ২. সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া; ৩. বাঙালি হত্যার তদন্ত সম্পন্ন করা এবং ৪. নির্বাচনে জয়লাভ করা দলের হাতে শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

তিনি বুঝিয়ে দিলেন ক্ষমতার মোহে তিনি রাজনীতি করেন না, তিনি রাজনীতি করেন জনগণের জন্য। এমনটি শুধু বঙ্গবন্ধুর মতো বড় মাপের নেতাই বলতে পারেন: ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন : ‘আমি পরিষ্কার করে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাছারি, আদালত-ফোজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’

আর এভাবেই তিনি সবার অজান্তে হয়ে ওঠেন সবার হৃদয়ের মণি আর নিজেই ‘কার্যত সরকার’ (ডি ফ্যাক্টো গভর্নমেন্ট)। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে তার হুকুমই চলবে যদি পাকিস্তানি শাসকরা দাবি মেনে না নেয়। তাই তিনি নির্দেশ দেন : ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য অন্য যে জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না।

রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দফতর, ওয়াপদা, কোনোকিছু চলবে না।’ কার্যত সব শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়ে তিনি সরকারি কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান: ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে।

যে পর্যন্ত আমাদের এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে, ততদিন খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হল- কেউ দেবে না।’ চাকরিজীবীদের কষ্টের কথা তিনি ভুলেননি। তারা যেন কষ্ট না পায় বেতনের অভাবে সেজন্য তিনি বললেন : ‘দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনেপত্র নিতে পারে।’

সবকিছুর শেষে তিনি কৌশলে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। প্রয়োজনে গেরিলা কায়দায় শত্রুকে মোকাবেলা করার ইঙ্গিত দেন : ‘আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।

তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ তিনি প্রকাশ্যে স্বাধীনতার কথা না বলে ঘুরিয়ে বলেন : ‘আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। … সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা মরতে যখন শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ তার এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থের সঙ্গে মিলে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ভাষণের কিছু অংশ।

চার্চিল তার বিখ্যাত ভাষণে বলেন : আমারা যুদ্ধ করব সাগরে-মহাসাগরে, যুদ্ধ করব আকাশে, … আমরা যুদ্ধ করব সমুদ্রতটে, মাঠে-ময়দানে আর রাস্তায় রাস্তায়। যুদ্ধ করব আমরা পাহাড়ে; করব না আত্মসমর্পণ কখনই।’ বঙ্গবন্ধু শাসকদের একদিকে দিয়েছেন অভয়বাণী, আরেকদিকে সাবধান করে দিয়েছেন: ‘তোমরা আমার ভাই, তেমারা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। … কিন্তু আমার বুকের ওপর গুলি চালানোর চেষ্টা করো না।’

মোনাফেকদের ব্যাপারে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন সবাইকে এবং একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সাবধান করে দিয়েছেন : ‘মনে রাখবা, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’

ভাষণে স্পষ্ট করে দিলেন তিনি, আরও কঠিন সংগ্রাম আমাদের করতে হবে। প্রস্তুতি নিতে হবে সংগ্রামের জন্য। বেশি কিছু বলেননি যাতে আবার আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে হামলা করার সুযোগ না নিতে পারে শাসকরা। সূক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী জাতির দিকনির্দেশক বুঝতে পেরেছিলেন, শাসকরা যদি একবার প্রমাণ করতে পারে যে ‘বাঙালিরা বিচ্ছিন্নতাবাদী’ তাহলে তারা বিদেশিদের সমর্থন পাবে।

আর মেজরিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে যাবে কেন? বিচ্ছিন্নতাবাদী যদি হতেই হয় তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানি মাইনরিটিরা হবে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ঘোষণা দেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবার সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

ড. এম এ মাননান : কলামিস্ট ও শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র:যুগান্তর