প্রণোদনা প্যাকেজগুলো শর্তের বেড়াজালে পড়েছে

8

রংপুর বার্তা.কম:করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সরকারের দেয়া প্রণোদনা প্যাকেজগুলো কঠিন শর্তের বেড়াজালে পড়েছে। ঘোষিত প্যাকেজগুলো থেকে ঋণ পেতে হলে একদিকে অনেক কঠিন শর্ত পালন করতে হবে, অন্যদিকে এসব শর্ত পালন করতে গেলে ঋণ পেতে ভোগান্তি হবে সীমাহীন।

শর্ত বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এছাড়া পুরো প্যাকেজগুলো ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকারদের সতর্ক হতে হবে। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঝুঁকি নেবে না। ফলে ব্যাংকগুলোও ঋণ বিতরণে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করবে। এতে ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে যারা এখন ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ লেনদেন করেন না, তাদের ঋণ পাওয়ার বিষয়টি আরও অনিশ্চয়তায় পড়বে।

শনিবার এমন সব শঙ্কার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।

সংকট নিরসনে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অবশ্যই ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের রাখতে হবে।

এছাড়া নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে সরকারের গ্যারান্টিতে একটি স্কিম গঠন করতে হবে। তা না হলে শুধু ব্যাংকার ও আমলাতন্ত্র দিয়ে এ সংকট উত্তরণ সম্ভব হবে না।

এভাবে কার্যকর টাস্কফোর্স করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর ভালো উদ্দেশ্যটি নানামুখী বাধার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে জটিলতার কারণে ঋণ পেতে বিলম্ব হলে শিল্পকারখানার শ্রমিকদের এপ্রিলের বেতন পরিশোধেও বিলম্ব ঘটবে। সেটি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিক-কর্মচারীরা রাস্তায় নেমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রণোদনা প্যাকেজগুলো হয়েছে ব্যাংকনির্ভর। এগুলো বাস্তবায়ন করবে বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংক তো তাদের নিজস্ব গ্রাহকদের বাইরে অন্য কাউকে ঋণ দিতে চাইবে না। আর ব্যাংকগুলো এমনিতেই রক্ষণশীল নীতিতে ঋণ বিতরণ করে। ফলে এ ধরনের সংকটে দ্রুতগতিতে ঋণ দেয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করা ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হবে। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নতুন উদ্যোক্তাদের তারা ঋণ দিতে চাইবেই না।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো যাতে ঋণ বিতরণ দ্রুত করে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ বিতরণ ও আদায়ে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। এগুলো শুধু ব্যাংকের ওপর চাপালে ব্যাংক ঋণ দিতে চাইবে না। সমন্বি^ত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

করোনার প্রভাব মোকাবেলায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিতে ১১টি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রফতানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল, বড় শিল্প ও সেবা খাতে চলতি মূলধনের জোগান দিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে চলতি মূলধন দিতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল, রফতানি খাতে পণ্য জাহাজীকরণের আগে ঋণ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল এবং রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ৩৫০ কোটি ডলার থেকি বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়েছে।

এতে তহবিলে যুক্ত হবে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে ২০ কোটি ইউরো বা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল, ফুল, ফল, ডেইরি, পোলট্রি শিল্পে ঋণ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল, এনজিওদের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে।

এছাড়া কৃষকদের ঋণ দেয়া হবে ৪ শতাংশ সুদে। চলতি বছরে সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির এলসির মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। এসব প্যাকেজের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে ৭৩ হাজার কোটি টাকা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পেতে কঠিন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ থেকে পুনঃঅর্থায়ন বাবদ যেসব ঋণ দেয়া হবে তা ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে আদায় করতে হবে। ঋণ আদায়ের কোনো ঝুঁকি বা দায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে না। ঋণ আদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। নির্ধারিত সময় পর বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে ওই অর্থ কেটে রাখা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ পেতে তিন পৃষ্ঠায় আবেদন করতে হবে। দিতে হবে নানা ধরনের তথ্য।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, ‘প্যাকেজগুলোর উদ্দেশ্যে ভালো। এখন এটি দ্রুত দিতে হবে। এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কেননা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ নিয়ে নানা ঝামেলা ও জটিলতার নজির রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হলে দ্রুত সব পক্ষের অংশ গ্রহণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এতে সব পক্ষের ব্যবসায়ীদের রাখতে হবে। যেখানেই সমস্যা হবে টাস্কফোর্সের নজরে আনলে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। তাহলেই এ প্যাকেজ সফল হবে।’

তিনি বলেন, লকডাউন আরও এক মাস দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি বেশি জটিল আকার ধারণ করবে। ফলে বর্তমান সংকট মোকাবেলা করতে দ্রুত ও ঝামেলা মুক্তভাবে ঋণ দিতে হবে। কোনো জাল-জালিয়াতি যাতে না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। যাদের ঋণের প্রয়োজন তারা যাতে পায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে সরকারের গ্যারান্টি দেয়া যেতে পারে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ‘আমাদের ঋণ বিতরণে আপত্তি নেই। কিন্তু ঋণের টাকা যাতে আদায় হয় সে বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অজুহাতে ঋণের অর্থ আদায় না হলে এর দায় এসে পড়বে ব্যাংকের ওপর। তখন আরও জটিল হলে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা।’

কুটির ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্যাকেজে বলা হয়েছে, ঋণ পেতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র লাগবে, মালিকানার ধরনের সনদ লাগবে, থাকতে হবে ট্রেড লাইসেন্স। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের এসব কাগজপত্র থাকলেও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের এসব নেই। ফলে তারা কিভাবে ঋণ পাবেন এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অথচ এ সংকটে তাদের ঋণের প্রয়োজনীয়তা কোনো অংশেই কম নয়।

এছাড়াও বর্তমান গ্রাহকদের কোনো ঋণ অবলোপন হয়ে থাকলে তারিখ ও পরিমাণ, গ্রাহকের বিদ্যমান ঋণ থাকলে বিতরণের পরিমাণ, মোট চলতি মূলধনের পরিমাণ, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিআইবির প্রতিবেদন লাগবে। এসব তথ্য সংগ্রহ করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। এসব তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করবেন একজন কর্মকর্তা। আরেকজন যাচাই করবেন।

এ রকম চার পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়ন পেতে তিনটি ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হবে। বড় শিল্প ও সেবা খাতের চলতি মূলতন পেতেও এসব শর্ত পালন করতে হবে। কৃষিঋণ ৪ শতাংশ সুদে দিতে হলে এক পাতার ফরম পূরণ করে দিতে হবে। অর্থবছর শেষ হওয়ার পরের মাসে সুদ-ভর্তুকির টাকা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে হবে।

কৃষি খাতে প্রণোদনার ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ঋণ নিতে ব্যাংকগুলোকে ১ শতাংশ সুদ দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৮ মাসে এ অর্থ ফেরত দিতে হবে। গ্রাহক ফেরত না দিলেও ব্যাংককেই দিতে হবে। মৎস্য, ডেইরি, পোলট্রি, ফল ও ফুল চাষে এ ঋণ পাওয়া যাবে।

বড় শিল্প ও সেবা খাতে চলতি মূলধনের জোগানে পুনঃঅর্থায়ন নিতে যে মাসে অর্থ বিতরণ করা হবে তার পরের মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। অর্থ পেতে তিন পাতার ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হবে।

রফতানি ঋণের বিপরীতে আবেদন করতে হলে অনেকগুলো শর্ত পালন করতে হবে। গ্রাহকের ঋণ বিতরণের সমন্বিত বিবরণী, আবেদন করা অর্থ সুদসহ পরিশোধের নিশ্চয়তাপত্র, রফতানি ঋণপত্রের আর্থিক বিশ্লেষণ, রফতানি পণ্য তৈরির নিশ্চয়তাপত্র, বিতরণ করা অর্থ ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে ৪ মাস পর বা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বর্ধিত সময়ের মধ্যে কেটে নেয়া হবে। ঋণের বিপরীতে কোনো ঝুঁকি থাকলে তা ব্যাংককে বহন করতে হবে।

প্রতিটি প্যাকেজেই ঋণের অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ থেকে ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করবে। বড় অংকের ঋণ সীমা মেনে চলতে হবে।
সুত্র:যুগান্তর