শীতের ভোরে দক্ষিণাঞ্চলের কোনো ঘেরে জাল ফেললে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে পারশে। বৈজ্ঞানিক নাম চেলন সাবভিরিডিস ( Chelon subviridis )। আগে ডাকা হতো লাইজা পারসিয়া ( Liza parsia ) নামে। সম্প্রতি এর গণ পাল্টেছে। মুজিলিডি পরিবারের এই মাছটা সরু, চকচকে, পিঠ কালচে ও পেটের দিকটা রুপালি। চোখজোড়া শরীরের তুলনায় একটু বড়, সবসময় যেন সজাগ কিছু একটা খুঁজছে। দক্ষিণের খাল-বিল, প্যারাবন, অগভীর নোনা জলাশয়—এসব জায়গাতেই এদের আসল সংসার

মাছচাষিদের মুখে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। পারশে চাষে ঝুঁকি কম। বাগদা চিংড়ির দাম আর রোগবালাই নিয়ে যেখানে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় চাষিদের, পারশে সেখানে অনেকটা নিশ্চিন্তে বেড়ে ওঠে। পোনা মজুদ করার চার-পাঁচ মাসের মাথায় একেকটা মাছ পৌঁছে যায় ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামে। বাজারে চাহিদা ভালো, দামও চড়া। কিন্তু এই লাভের অঙ্কের পেছনে কাজ করে একটা জৈবিক জেদ, যেটা বোঝা দরকার

পারশের প্রজনন-স্বভাব একটু অন্যরকম। বেশিরভাগ মিঠাপানির মাছ বর্ষায় ডিম ছাড়ে। পারশে হাঁটে উল্টো পথে—ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, একদম শীতের মধ্যে। সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে ডিসেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহ আর ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহে। জলের তাপমাত্রা তখন নামতে থাকে, লবণাক্ততাও বদলায় ধীরে ধীরে, আর এই বদলটাই বোধহয় মাছের শরীরে পাঠায় এক ধরনের সংকেত

পাঙাশ মাছের গায়ে আঁশ নেই কেন পারশের প্রজনন-স্বভাব একটু অন্যরকম। বেশিরভাগ মিঠাপানির মাছ বর্ষায় ডিম ছাড়ে। পারশে হাঁটে উল্টো পথে—ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, একদম শীতের মধ্যে

প্রজননের জন্য পারশে বেছে নেয় বেশি লোনা পানি। মিঠা আর নোনার মিশ্রণে দিন কাটানো এই মাছ ডিম ছাড়ার সময় সরে যায় লবণাক্ততা বেশি এমন অংশে। মুজিলিডি পরিবারের বাকি সদস্যদের মধ্যেও প্যাটার্নটা এক। গ্রে মুলেট প্রজাতির মাছেরা মৌসুম শুরুতে ঝাঁক বেঁধে জড়ো হয় মোহনায়, তারপর পাড়ি জমায় গভীর সমুদ্রের দিকে। শীতল স্রোত, বায়ুচাপের ওঠানামা—এসবই নাকি তাদের যাত্রার ইশারা দেয়

মুগিল সেফালাসের ( Mugil cephalus ) মতো বড় প্রজাতির একটা স্ত্রী মাছে পাঁচ লাখ থেকে বিশ লাখ পর্যন্ত ডিম পাওয়া গেছে। পারশে আকারে ছোট, সংখ্যাটা তাই কম হবে হয়তো, কিন্তু কৌশলটা একই থাকে। একবারে নয়, দফায় দফায়। স্ত্রী মাছের ডিম্বাশয়ে সব ডিম একসঙ্গে পাকে না, ধাপে ধাপে পরিণত হয়, ছাড়া হয় কয়েক দফায়—একই প্রজননকালের মধ্যেই

পনেরো মাসেই পারশের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। সংখ্যাটা সহজ নয় আসলে। বেশিরভাগ মাছের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হতে অনেক বেশি সময় লাগে, বিশেষত যেসব প্রজাতি বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছাতে দেরি করে। পারশে অল্প বয়সেই প্রজননক্ষম, প্রতি মৌসুমে একাধিকবার ডিম ছাড়ে, ডিমের সংখ্যাও অনেক

নদীর ভেটকি আর সমুদ্রের কোরাল কি একই মাছ মুগিল সেফালাসের মতো বড় প্রজাতির একটা স্ত্রী মাছে পাঁচ লাখ থেকে বিশ লাখ পর্যন্ত ডিম পাওয়া গেছে। পারশে আকারে ছোট, সংখ্যাটা তাই কম হবে হয়তো, কিন্তু কৌশলটা একই থাকে

নিষিক্ত ডিম ভাসমান, স্বচ্ছ, হালকা—স্রোতের সঙ্গে ভেসে বেড়ায়। মুজিলিডি পরিবারের অন্য প্রজাতিতে দেখা গেছে ডিম ফুটতে সময় লাগে প্রায় দুই দিন, সদ্য ফোটা লার্ভার তখনো মুখ কিংবা জোড়া পাখনা তৈরি হয়নি। এই লার্ভা ভেসে চলে যায় মোহনা আর উপকূলীয় জলাশয়ের দিকে, খাবার বেশি যেখানে, শিকারির চাপ তুলনামূলক কম। বড় হতে হতে একদিন এরাই হয়ে যায় বাজারের ঝুড়িতে চেনা সেই পারশে

সব ডিম অবশ্য বাঁচে না। এক হাজার লার্ভার মধ্যে হয়তো একটাও পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠে না। শিকারি মাছ, পাখি, প্রতিকূল স্রোত, খাদ্যাভাব—সব মিলিয়ে বেশিরভাগ লার্ভাই হারিয়ে যায় পথে। খাদ্যাভ্যাসও এখানে একটা ভূমিকা রাখে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পারশে খায় ক্ষুদ্র প্রাণিকণা, বড় হলে শেওলা আর ডায়াটমসহ জৈব পদার্থ। এই বহুমুখী খাদ্যাভ্যাসের কারণে অন্য মাছের সাথে প্রতিযোগিতা কম লাগে, বিশেষত খাদ্যসীমিত জলাশয়ে। খাল-বিল আর প্যারাবনের ঘোলা জলেও মানিয়ে নেয় সহজে, আর এই সহনশীলতাটাই আসলে জনসংখ্যা টিকিয়ে রাখার একটা বড় কারণ

কোরাল মাছকে এত লাল দেখায় কেন এক হাজার লার্ভার মধ্যে হয়তো একটাও পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠে না। শিকারি মাছ, পাখি, প্রতিকূল স্রোত, খাদ্যাভাব—সব মিলিয়ে বেশিরভাগ লার্ভাই হারিয়ে যায় পথে। খাদ্যাভ্যাসও এখানে ভূমিকা রাখে

চাষের বেলায় এই বৈশিষ্ট্যটাই কাজে লাগছে। বাগদা চিংড়ির মতো সংবেদনশীল প্রজাতি সামান্য রোগেই মড়কের মুখে পড়ে, পারশে সেখানে জেদি টিকে-থাকা প্রাণী। দ্রুত বংশবৃদ্ধি মানে দ্রুত ফলন, পুঁজি ফেরত পাওয়ার সময়ও কম লাগে। ৪০ থেকে ৮০ গ্রাম ওজন হলেই বাজারজাত করা যায়, আর এই স্বল্প চক্রটাই দক্ষিণাঞ্চলের ঘেরগুলোতে পারশেকে বাগদার বিকল্প করে তুলছে দিন দিন

তবে যে মোহনা আর উপকূলীয় জলাশয়ে পারশে সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে সেগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি চাপে। দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত চিংড়িঘের বিস্তার—প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে ক্রমশ। মাছটা যতই দ্রুত বংশ বাড়াক, জন্মভূমিটা না থাকলে সেই ক্ষমতার কী মানে থাকে আর

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট

ছুরি মাছ কি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে