‘মাংস খেতে ভালোবাসেন কেন’—এমন প্রশ্নের উত্তরে বেশিরভাগ মানুষ হয়তো স্বাদের কথা বলবেন। পুষ্টির কথাও বলতে পারেন। কিন্তু গবেষকেরা খুঁজে পেয়েছেন এক অবাক করা কারণ। মানুষ অজান্তেই মন থেকে মাংসকে নিজেদের সামাজিক মর্যাদার প্রতীক মনে করে। বিশেষ করে যারা নিজেদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা অসন্তুষ্ট, তারা নিজেদের মর্যাদা বোঝাতে মাংসকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেন

আগের দিনের কৃষিনির্ভর সমাজে মাংস পাওয়া ছিল বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল। প্রতিদিন কেবল রাজা-বাদশাহ আর ধনী ব্যবসায়ীদের পাতেই মাংস থাকত। সাধারণ মানুষের কপালে বছরে দু একবারের বেশি মাংস মিলত না

মধ্যযুগের মতো বর্তমানে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মাংসের দামের পার্থক্য হয়তো ততটা বেশি নয়। তাও মাংসের দাম সবসময় একটু বেশিই থাকে। তবে কম আয়ের মানুষ কেন দামি এই খাবারটি বেছে নিচ্ছেন, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার ইউজিন চ্যান এবং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির ডাক্তার নাটালিনা জ্লাতেভস্কা

অন্য প্রাণীদের মতো আমরা কাঁচা মাংস খেতে পারি না কেন আগের দিনের কৃষিনির্ভর সমাজে মাংস পাওয়া ছিল বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল। প্রতিদিন কেবল রাজা-বাদশাহ আর ধনী ব্যবসায়ীদের পাতেই মাংস থাকত

যুক্তরাজ্যের অ্যাপেটাইট জার্নালে তাঁরা গবেষণাটি প্রকাশ করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজের সামাজিক অবস্থান নিয়ে চিন্তাগুলো একটু বদলে দিয়ে তারা মাংস খাওয়ার আগ্রহ বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে পেরেছেন। বিজ্ঞানী ইউজিন চ্যান জানান, ‘মানুষকে খুব সহজেই সাময়িকভাবে নিজেদের ধনী বা গরিব ভেবে নিতে বাধ্য করা যায়।’

গবেষণায় একদল শিক্ষার্থীকে ভাবতে বলা হয়েছিল, তারা প্রথম চাকরিতেই ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার আয় করছেন। তা দিয়ে কত কী কেনা সম্ভব। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলকে বলা হয়েছিল একই টাকায় কত টানাটানি হবে আর কী কী কেনা যাবে না, তা নিয়ে ভাবতে। এরপর দুই দলের কাছেই জানতে চাওয়া হয়, তারা সমাজে নিজেদের কোন অবস্থানে ভাবছেন। আর ধনীদের প্রতি তাদের কোনো হিংসা হচ্ছে কি না

এরপর সবার সামনে নানা রকম খাবার এনে রাখা হয়। সেখানে কে কোনটা নিচ্ছেন তা খেয়াল করা হয়। দেখা গেল, যারা নিজেদের অবস্থান নিচু ভেবে দুশ্চিন্তা করছিলেন তারা শাকসবজি বাদ দিয়ে সোজা মাংসের বার্গার বেছে নিয়েছেন

শুধু মাংস খাওয়া কি স্বাস্থ্যসম্মত, নাকি ক্ষতিকর বিজ্ঞানী ইউজিন চ্যান জানান, ‘মানুষকে খুব সহজেই সাময়িকভাবে নিজেদের ধনী বা গরিব ভেবে নিতে বাধ্য করা যায়।’

মাংস খাওয়ার সঙ্গে শক্তি, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এটি উঁচু সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। মেহমানদারি কিংবা বড় কোনো উৎসবে প্রধান খাবার হিসেবে মাংস পরিবেশনের রীতি বহু পুরনো। তাই মানুষের মন ও মর্যাদার সঙ্গে মাংসের সংযোগটা ঠিক কেমন, তা নিয়েই গবেষণাটি করা হয়েছিল

গবেষকেরা এই অদ্ভুত সম্পর্কের পেছনে অতীত ইতিহাসকে কারণ হিসেবে দেখান। বহু আগে কেবল তাদেরই মাংস কেনার ক্ষমতা ছিল, যারা সমাজে ধনী ও প্রভাবশালী ছিলেন। এভাবেই মাংস খাওয়াটা ক্ষমতা ও ধনসম্পদের প্রতীকে পরিণত হয়। তবে আজকাল অনেক ধনী ব্যক্তি নিরামিষ খাবার বেছে নিচ্ছেন। তাই ভবিষ্যতে মানুষের মনের এই ধারণা পাল্টেও যেতে পারে

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

মাংস রান্নার রসায়ন