চব্বিশের জুলাই–আগস্টের পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি শুনি, তা হলো প্রশাসনে সংস্কার হলো না কেন? প্রশ্নটি সরল, তবে এর ভেতরে একটি অনুমান লুকিয়ে আছে—সংস্কারের আন্তরিক চেষ্টা হয়েছিল এবং তা ব্যর্থ হয়েছে। গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন সাক্ষ্য দেয়। বস্তুত, সংস্কার ব্যর্থ হয়নি; বরং সংস্কার ঠেকানোর প্রকল্প সফল হয়েছে। তাই আসল প্রশ্ন দুটি—কে, কীভাবে সেই সাফল্য নিশ্চিত করল, আর এখন কী করা যায়
২
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত দিশাহারা। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিল, কিন্তু তখনো তার নীতি, অগ্রাধিকার ও জবাবদিহির কোনো কাঠামো দাঁড়ায়নি। পুলিশ মাঠে নেই, সচিবালয়ে শৃঙ্খলা নেই। এই শূন্যতায় সবচেয়ে সংগঠিত ও দ্রুত সাড়া দিল আমলাতন্ত্রের একটি অংশ। ১৩ আগস্ট রাতে শতাধিক সিনিয়র সহকারী সচিব উপসচিব হলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে দুই শতাধিক উপসচিব হলেন যুগ্ম সচিব। ২৫ আগস্ট ১৩১ জন যুগ্ম সচিব হলেন অতিরিক্ত সচিব
গেজেট ঘেঁটে দেখা গেছে, অন্তত ২৪ জন কর্মকর্তা দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিন ধাপ পেরিয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন। বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা চুক্তিতে সচিব হয়ে ফিরলেন। পরে ‘বঞ্চিত’ বিবেচনায় ৭৬৪ জন অবসরপ্রাপ্তকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হলো। তাঁদের মধ্যে ১১৯ জন সচিব। এত অল্প সময়ে প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তার পদোন্নতি! বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর কোনো দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। একে তুঘলকি কাণ্ড বললে কম বলা হয়
বঞ্চনা মিথ্যা ছিল না। দেড় দশকে দলীয় আনুগত্যের মাপকাঠিতে বহু যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি, ওএসডি হয়েছেন, বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন। কিন্তু প্রতিকারের পথ ছিল প্রকাশ্য মানদণ্ড, স্বাধীন পর্যালোচনা ও সময় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া। তার বদলে হলো সচিবালয়ে দলবদ্ধ চাপ আর রাতারাতি প্রজ্ঞাপন। একটি অনিয়ম আরেকটি অনিয়ম দিয়ে শোধরানো যায় না। তাতে কেবল সুবিধাভোগীর মুখ বদলায়, ব্যবস্থাটি অক্ষত থাকে
৩
ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক আমলাতন্ত্রকে দেখেছিলেন আইনি-যৌক্তিক কর্তৃত্বের বাহন হিসেবে—নৈর্ব্যক্তিক বিধি, লিখিত নথি, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক পেশাজীবন। শাসক বদলায়, কিন্তু এমন প্রশাসন রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, বিপ্লবের পরেও। আবার ওয়েবারই সতর্ক করেছিলেন, একবার প্রতিষ্ঠিত হলে আমলাতন্ত্র প্রায় অবিনাশী হয়ে ওঠে এবং যে তার নিয়ন্ত্রণ পায়, তারই কাজে লাগে
বাংলাদেশ দ্বিতীয় সতর্কবাণীকেই সত্য প্রমাণ করেছে, প্রথম প্রতিশ্রুতিকে নয়। অভ্যুত্থানের পর আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের স্থিতির নোঙর হয়নি। রাষ্ট্রের দুর্বলতম মুহূর্তকে সে নিজের সুবিধা পুনর্বণ্টনের সুযোগ বানিয়েছে। নিয়ম মানা হয়েছে আকারে—গেজেট, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড, প্রজ্ঞাপন সবই আছে। কিন্তু নিয়মের মর্ম, অর্থাৎ নৈর্ব্যক্তিকতা ও যোগ্যতা উধাও। সংগঠন তত্ত্বে একে বলা হয় ব্যুরো-প্যাথোলজি বা আমলাতান্ত্রিক ব্যাধি। উপায় যখন লক্ষ্যকে গ্রাস করে, রবার্ট মার্টনের ভাষায় ‘লক্ষ্যচ্যুতি’ ঘটে, আর প্রতিষ্ঠানের আসল উদ্দেশ্য—নাগরিক সেবা—হারিয়ে যায়
কাজী মারুফুল ইসলাম
অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের সামনে উভয়সংকট সব দেশেই এক: পুরোনো আমলাতন্ত্র ভেঙে দিলে রাষ্ট্র অচল হয়, অক্ষত রাখলে পুরোনো ক্ষমতা নতুন পোশাকে ফেরে। এই দ্বিধার সমাধান গণছাঁটাই নয়, আবার নিঃশর্ত আস্থাও নয়। সমাধান হলো নিয়মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, যাতে স্থিতি আসে ব্যক্তির আনুগত্য থেকে নয়, প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা থেকে। আমরা ঠিক উল্টোটা করেছি: প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে ব্যক্তি বদলেছি
৪
প্রয়াত অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বোঝাতে মুদ্রা-অর্থনীতির গ্রেসামের সূত্র ধার করেছিলেন। মন্দ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়। তাঁর বিশ্লেষণে রাজনীতিকীকৃত প্রশাসনে অনুগত ও অযোগ্যরা ক্রমে যোগ্য ও স্বাধীনচেতাদের কোণঠাসা করেন, ফলে পুরো ব্যবস্থার মান নামে। চব্বিশের পর যা দেখলাম, তা এই সিনড্রোমের নিরাময় নয়, নতুন সংস্করণ। আনুগত্যের দিক বদলেছে, আনুগত্যের অর্থনীতি বদলায়নি। যিনি নিয়ম মেনে অপেক্ষা করেছেন, তিনি আবার পিছিয়েছেন; যিনি দল বেঁধে চাপ দিয়েছেন, তিনি এগিয়েছেন। প্রণোদনার এই বার্তা পরের প্রজন্মের কর্মকর্তারাও পড়ে ফেলেছেন
ড. খানের রূপকটি আরেকটু টেনে বলা যায়, মন্দ মুদ্রা এবার ভালো মুদ্রার পোশাক পরে বাজারে ঢুকেছে, ‘বঞ্চিত’ পরিচয়ে
৫
এই পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শতাধিক সুপারিশ দিয়েছিল: পদোন্নতিতে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই বন্ধ, কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ, সিভিল সার্ভিস আচরণবিধি, প্রশাসনিক ন্যায়পাল, স্থায়ী সংস্কার কমিশন। কমিশন নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছিল, স্বাধীনতার পর দুই ডজনের বেশি কমিশন-কমিটির সুপারিশ টেকসই হয়নি। এবারও তা-ই হলো। ১৮টি ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ সুপারিশ বাছাই হলো, বাস্তবে এল গণশুনানি বা পাসপোর্টকে অধিকার ঘোষণার মতো নিরীহ কয়েকটি বিষয়। উল্টো কমিশন যে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধানের বিরুদ্ধে বলেছিল, সেই বিধানেই কর্মকর্তাদের বিদায় চলল; সরকারি চাকরি আইন সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়া হলো আনুগত্য ও শৃঙ্খলায়, সেবায় নয়
মূল্যস্ফীতির এক দশকে বেতন সমন্বয়ের যুক্তি অস্বীকার করি না। প্রশ্নটি অনুপাতের—বেতন বাড়ানোয় সর্বদলীয়, সর্বক্যাডার ঐকমত্য। সেবার মান বাড়ানোয় সর্বদলীয় নীরবতা
কেন? প্রতিবেদন প্রকাশের পরপর প্রশাসন ক্যাডার উপসচিব পদে ৫০ শতাংশ কোটার প্রস্তাবকে ষড়যন্ত্রমূলক বলল। ২৫ ক্যাডারের পরিষদ জানাল, কোনো কোটাই মানবে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারও আপত্তি তুলল। লড়াইটা দেখতে বিভাজনের, কিন্তু কাঠামোগতভাবে এটি এক নেতিবাচক ঐকমত্য—ভাগ নিয়ে বিবাদ। অথচ জবাবদিহি, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ও নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধতা আলোচ্যসূচির বাইরে রাখায় অদৃশ্য ঐকমত্য। প্রত্যেক ক্যাডার বৈষম্যের ভাষায় কথা বলেছে। কোনো ক্যাডার সেবার ভাষায় কথা বলেনি
সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ বেতন। এ বছরের আগস্টের শেষে নির্বাচিত সরকার নবম জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে; সর্বনিম্ন মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ, বেতন কমিশনের হিসাবে বাড়তি দায় প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির এক দশকে বেতন সমন্বয়ের যুক্তি অস্বীকার করি না। প্রশ্নটি অনুপাতের—বেতন বাড়ানোয় সর্বদলীয়, সর্বক্যাডার ঐকমত্য। সেবার মান বাড়ানোয় সর্বদলীয় নীরবতা। কোনো কর্মদক্ষতা চুক্তি নেই, সেবা দেওয়ার বাধ্যতামূলক সময়সীমা নেই, নাগরিক সন্তুষ্টির মাপকাঠি নেই। করদাতা দাম দিচ্ছেন; কী কিনছেন, কেউ বলছে না
পদোন্নতি, পদায়ন ও বেতনের বিনিময়ে অনুগত প্রশাসন গড়ে তুলতে চায়। মুশতাক খান যাকে ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলেন, অভ্যুত্থান তা ভাঙেনি, কেবল নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। সংস্কার তাই এই পুরোনো বন্দোবস্তের প্রতিপক্ষ ছিল। অবশেষে সেই বন্দোবস্তই বহাল রইল
এখানে হামজা আলাভির ‘অতিবিকশিত রাষ্ট্র’-এর ধারণা কাজে আসে। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারে পাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্র সমাজের তুলনায় এত শক্তিশালী যে আমলা-অভিজাতরা নিজেরাই এক স্বতন্ত্র ক্ষমতাকেন্দ্র। দুর্বল দলীয় রাজনীতি তাদের ছাড়া দেশ চালাতে পারে না, তাই সংস্কারের বদলে সমঝোতা বেছে নেয়। পদোন্নতি, পদায়ন ও বেতনের বিনিময়ে অনুগত প্রশাসন গড়ে তুলতে চায়। মুশতাক খান যাকে ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বলেন, অভ্যুত্থান তা ভাঙেনি, কেবল নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। সংস্কার তাই এই পুরোনো বন্দোবস্তের প্রতিপক্ষ ছিল। অবশেষে সেই বন্দোবস্তই বহাল রইল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জরুরি প্রয়োজনীয় মুহূর্তে এই আপাত–অনুগত আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করতে আসে না। শেখ হাসিনার আমলই এর সবচেয়ে তরতাজা উদাহরণ
৬
হতাশা কোনো নীতি নয়। মনে রাখা দরকার, বিশ্বজুড়ে আমলাতন্ত্রের চেহারা বদলাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, উন্মুক্ত তথ্য আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রশাসনের বিবেচনাধীন ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে; নাগরিক আর দপ্তরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রার্থী নন, তিনি অনলাইনে নজরদার। আমাদের সংস্কারকে এই বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে হবে। পাঁচটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এখনই নেওয়া যায়
এক. ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সব পদোন্নতি স্বাধীন পর্যালোচনা প্যানেলে যাচাই। গণছাঁটাই বা প্রতিশোধ নয়; প্রতিটি ক্ষেত্রে মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া প্রকাশ্য করা। অনিয়মকে অনিয়ম বলে স্বীকার করাই প্রথম সংশোধন
দুই. পদোন্নতিকে ডিজিটাল ও যাচাইযোগ্য করা। প্রত্যেক কর্মকর্তার চাকরির ইতিহাস, মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ও শাস্তির রেকর্ড একটি সুরক্ষিত তথ্যভান্ডারে থাকলে ১৫ দিনে তিন ধাপ পদোন্নতি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত হবে। আধুনিক প্রশাসনে তথ্যের স্বচ্ছতাই সবচেয়ে কার্যকর পাহারাদার
তিন. সেবার মান মাপা। ই-নথি আছে, কিন্তু কোন নথি কোথায় কত দিন আটকে থাকে, তার প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিশ্লেষণে কোন দপ্তরে ফাইল জমে, কোথায় অভিযোগ ঘনীভূত, তা চিহ্নিত করা কঠিন নয়। প্রযুক্তি আমলাতন্ত্রকে প্রতিস্থাপন করবে না, কিন্তু তার বিবেচনাধীন ক্ষমতার অন্ধকার কোণে আলো ফেলতে পারে
চার. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শত্রু না ভেবে জবাবদিহির মঞ্চ বানানো। কর্মকর্তা ফেসবুকে লিখলে সাময়িক বরখাস্ত হন, অথচ নাগরিক সেখানে অভিযোগ জানালে কোনো দপ্তর সাড়া দিতে বাধ্য নয়। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ্য সাড়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়
পাঁচ. বেতন বৃদ্ধিকে কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা। নতুন কাঠামোর পরবর্তী ধাপগুলো দপ্তরভিত্তিক সেবা-মানদণ্ড পূরণের শর্তে ছাড় হোক। আর কমিশনের প্রস্তাবিত স্থায়ী সংস্কার কমিশন গঠিত হোক সংসদের কাছে দায়বদ্ধ রেখে, যাতে সংস্কার কোনো সরকারের মর্জির ওপর না ঝোলে
৭
যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম, তার উত্তর দিয়ে শেষ করা যাক। সংস্কার কি ব্যর্থ হয়েছে? না, সংস্কার না হওয়াটাই একটি সফল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের ফল। কিন্তু সেই সাফল্যের দাম দিচ্ছেন সেই মানুষেরা, যাঁদের রক্তে চব্বিশের আগস্ট এসেছিল; যাঁরা ভূমি অফিসে দিনের পর দিন ঘোরেন, যাঁরা একটি সনদের জন্য ঘুষ দেন
কার্যকর রাষ্ট্র মানে কেবল স্থিতিশীল রাষ্ট্র নয়। যে রাষ্ট্র নাগরিককে সেবা দিতে পারে না, তার স্থিতি আসলে স্থবিরতা। প্রশাসন কার—কর্মকর্তার, দলের, না নাগরিকের? এ প্রশ্নের মীমাংসা না করে জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা হবে না। l
* কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
