খবরটা পড়ার পর থেকে আমার মাথার ভেতর একটা ঘণ্টা বাজছে। এক বছরে তিন দফায় ৭১৯ টাকা দাম বেড়ে গেল সিলিন্ডার গ্যাসের। তথ্য উপদেষ্টা মহোদয় বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা মাথায় রেখে এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে
কী দারুণ দূরদর্শী কথা! আমরা সাধারণ মানুষ কেবল বর্তমানের পেটের জ্বালা বুঝি, ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ বুঝি না। যেমন ধরেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্যাসের সিলিন্ডারে দেশলাইয়ের কাঠি ঠেকিয়ে যখন দেখি আগুন জ্বলে না, তখন আমরা অকারণই মেজাজ হারাই। সকালে চা না খেলে তো আমাদের আবার কোনো কিছুই ভালো লাগে না
কিন্তু সরকারের এ মহৎ বাণী শোনার পর আমাদের টনক নড়েছে। সরকার চাচ্ছে আমরা যেন গ্যাসের অপব্যবহার না করি। সিলিন্ডারের দাম যত বেশি হবে, আমাদের মন তত বেশি নরম হবে, রান্নার সময় গ্যাস নিয়ে আমাদের কৃপণতা তত বাড়বে। আর কৃপণতা বাড়লে সঞ্চয় বাড়বে, সঞ্চয় বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত হবে; এ তো সোজা হিসাব!
এ গভীর চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি যখন বাজারের থলে হাতে রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছি, তখনই মিতা এসে আমার সামনে হাজির। মিতার মুখের যে ভাব, তাতে মনে হচ্ছে আমার দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কোনো বালাই নেই, ওর তাৎক্ষণিক মেজাজটাই এখন মূল বিষয়
দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ তোমার পকেটেই থাকুক। আজ থেকে কাঠ-কয়লা দিয়ে উনুন জ্বালাব। দেখি, তোমার এই সিলিন্ডারের দাম সরকার কত দূর বাড়াতে পারে! মিতা কোমরে হাত দিয়ে বলল, ‘আজ বাজারে যাবে না? সিলিন্ডারে গ্যাস শেষ! নতুন একটা সিলিন্ডারের দাম কত জানো এখন? আগের চেয়ে তো অনেক বেশি বেড়ে গেছে!’
আমি একটু মুচকি হেসে সান্ত্বনার সুরে বললাম, ‘আরে মিতা, মন খারাপ করছ কেন? একটু বোঝার চেষ্টা করো। সরকার তো এমনি এমনি দাম বাড়ায়নি। এটা হলো দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ।’
‘কিসের কল্যাণ?’ মিতার চোখ দুটো হঠাৎ আনন্দে বড় হয়ে গেল
‘দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ! গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে আমাদের খরচের বাজেট কমে আসবে। আমরা এখন থেকে মেপে মেপে রান্না করব। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একফোঁটা গ্যাসও অপচয় হবে না। ভাবো তো, এর ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের কী দারুণ উন্নতি হবে! তেল-মসলাদার ভারী রান্না কমে গিয়ে আমরা সবাই হয়তো আস্তে আস্তে স্বাস্থ্যকর সেদ্ধ খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ব। জাপানের মতো জাতি হিসেবে আমরা আরও দীর্ঘায়ু হব, না?’
মিতা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর এমন একটা দৃষ্টি দিল যেন সে এইমাত্র আবিষ্কার করেছে যে সে কোনো বদ্ধপাগলকে বিয়ে করেছে। সে বলল, ‘রান্নাঘরে গ্যাস নেই আর তোমার মাথায় এখন ফিলোসফি আসছে! এক মাসের চাল-ডালের বাজার করতে গিয়ে যে পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে, সেটার কল্যাণ কে করবে?’
‘আরে ধুর, টাকা হলো হাতের ময়লা!’ আমি বুক ফুলিয়ে বললাম
কিন্তু মনে মনে হিসাব করলাম, সিলিন্ডারের যে দাম বেড়েছে, তাতে মাসের শেষে চায়ের দোকানে বাকি পড়ার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বউ এ দুর্দিনে বারবার চা করে দেবে না নিশ্চিত
ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দেখি আমার কলিগ, শুভ্র। যার কিছুদিন আগে বৃষ্টির সাথে হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়ার ঝামেলায় বিয়ে প্রায় ভেঙে যেতে বসেছিল। হবু শ্বশুরকে চা দিতে গিয়ে কারেন্ট চলে যায়, চা পড়ে যায় শ্বশুড়ের গায়ে। আমি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নার রোল ভেসে এল
‘কী ব্যাপার, শুভ্র? আবার কী হলো?’
শুভ্র হাঁপাতে হাপাতে বলল, ‘ভাই, বৃষ্টির সাথে তো ঝামেলা মিটেই গেছিল। কিন্তু আজ নতুন বিপত্তি!’
‘কী বিপত্তি আবার?’
‘বৃষ্টির মা সিলিন্ডারের নতুন দাম দেখে হিসাব কষেছেন। উনি বলেছেন, বর্তমান বাজারের গ্যাস দিয়ে সংসার চালানো মানে প্রতি মাসে দেউলিয়া হওয়া। তাই উনি আজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এলপিজির এই চড়া বাজারে তিনি এমন জামাই চান না যে বউয়ের বাড়িতে এসে দুইবেলা পেটপুরে পোলাও-বিরিয়ানি খাবে। ভাই, আমার বিয়েটা বোধ হয় পাকাপাকিভাবে ভেঙেই গেল!’
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘আরে শুভ্র, ধৈর্য ধরো ভাই। সরকার তো আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্যই...’
‘আপনার মুখেও ওই কথা মানায় না, ভাই!’
শুভ্র কেঁদে ফেলল, ‘আমার কপালে কল্যাণ দূর কি বাত, গ্যাসে ছ্যাঁকা খাওয়া ছাড়া আর কিচ্ছু জুটেছে, বলুন তো?’
ফোনটা রেখে আমি যখন মিতার দিকে তাকালাম, দেখলাম মিতা ইতিমধ্যেই একটা পুরোনো পাতিলে কয়লা জোগাড় করা শুরু করে দিয়েছে। সে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘শোনো মিস্টার দার্শনিক, দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ তোমার পকেটেই থাকুক। আজ থেকে কাঠ-কয়লা দিয়ে উনুন জ্বালাব। দেখি, তোমার এই সিলিন্ডারের দাম সরকার কত দূর বাড়াতে পারে!’
আমি আর টুঁ শব্দ করলাম না। বুঝলাম, দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের চক্করে পড়ে আজ রাতে কয়লার ধোঁয়া খাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই
আর এ–ও ভাবছি, না জানি সরকার আবার কখন কয়লার দাম বাড়িয়ে দেয়
সরকারি ফ্ল্যাটের বেসরকারি ব্যবস্থাপক কাকালাপ পাতি-নেতাদের নামতা একটি প্রকল্পের আত্মকাহিনি স্যরি! আপনি কত বড় মিথ্যাবাদী? উগান্ডার হুইপের ফেসবুক প্রোফাইল বেরেক কাম করে না!
