দেশের বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা ও অবসরকালীন প্রস্তুতি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মীর কোনো নির্দিষ্ট অবসরকালীন আর্থিক পরিকল্পনা নেই। মূলত তাৎক্ষণিক আর্থিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে কর্মীরা ভবিষ্যৎ বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন

বহুজাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ বাংলাদেশের করা সর্বশেষ ‘এমপ্লয়ি বেনিফিট ট্রেন্ডস স্টাডি (ইবিটিএস) ২০২৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার রাজধানীর মতিঝিলে মেটলাইফ বাংলাদেশের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এই জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড প্রোডাক্ট নওফেল আনোয়ার, হেড অব কমিউনিকেশনস সাইফুর রহমান

চলতি বছরের আগস্ট মাসে মেটলাইফের জরিপটি করা হয়। জরিপে দেশের বিভিন্ন খাতের ৭০৯ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ণকালীন কর্মী ছিলেন ৫৮৩ জন এবং নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধাসংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ছিলেন ১২৬ জন। তৈরি পোশাক খাত, এনজিও, ব্যাংক, এফএমসিজি, টেলিকম, খুচরা বিক্রেতা প্রভৃতি খাতের কর্মীরা জরিপে তথ্য দিয়েছেন

জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, অপ্রত্যাশিত আর্থিক চাপ ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে তাঁদের কর্মীদের কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় ৭২ শতাংশ কর্মী বলেছেন, অপ্রত্যাশিত আর্থিক চাপ তাঁদের কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে তাঁদের ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের প্রবণতা কমে যায়

* জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৯১% মনে করেন, এআই তাঁদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।* ৭২% কর্মী মনে করেন, অপ্রত্যাশিত আর্থিক চাপ তাঁদের কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

জরিপে বেসরকারি খাতের প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট অবসরকালীন পরিকল্পনা নেই। গত বছর এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ, অর্থাৎ আগের তুলনায় বর্তমানে বেসরকারি খাতের কর্মীরা বেশি আর্থিক চাপে রয়েছেন। ফলে একটি বড় অংশের কর্মীদের অবসরকালীন পরিকল্পনাও কমেছে

মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড প্রোডাক্ট নওফেল আনোয়ার বলেন, জরিপে উঠে এসেছে যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী বড় ধরনের খরচের চাপে রয়েছেন। এটি হতে পারে ব্যয়ের তুলনায় আয় কম কিংবা তাঁদের খরচের চাহিদা ও খাত বেড়ে গেছে। এ কারণে কর্মীদের অবসরকালীন পরিকল্পনা কমেছে

চাকরিদাতাকে পাশে চান কর্মীরা

জরিপে উঠে এসেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মনে করছেন, তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা বা ওয়েলবিং নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মী এমন মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ৮৬ শতাংশ কর্মী চান, প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের অবসরকালীন সঞ্চয়ে সরাসরি সহায়তা করুক

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কতটা ব্যবহার করছেন, সেটিও মেটলাইফের জরিপে উঠে এসেছে। জরিপের তথ্যে দেখা গেছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক চাপ কমাতে বড় ভরসা হয়ে উঠছে এআই। দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় ৫৫ শতাংশ, অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি কর্মী বর্তমানে এআই ব্যবহার করছেন

এআই ব্যবহারকারীদের প্রায় ৯১ শতাংশ জানিয়েছেন, এটি তাঁদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহারের ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যে ও কর্মদক্ষতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে

জরিপে উঠে এসেছে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক শান্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহানুভূতিশীল সংস্কৃতি বা ‘কেয়ার কালচার’-এর বড় ভূমিকা রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা মনে করেন, তাঁদের প্রতি নিয়োগকর্তা বা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপকদের সহানুভূতি ও যত্ন রয়েছে, সেখানে চাকরির সন্তুষ্টির হার অনেক বেশি। জরিপে এই সন্তুষ্টির হার ৯২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে

মেটলাইফের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সার্বিক কাজের সন্তুষ্টির হার ৮৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ সার্বিক কাজের সন্তুষ্টির হার আগের তুলনায় বেড়েছে। জরিপে আরও উঠে এসেছে, কর্মীরা গুরুতর অসুস্থতার মতো যেসব ক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রত্যাশা করেন এবং নিয়োগকর্তারা বাস্তবে যা প্রদান করেন, তার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। যেমন জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ শতাংশ কর্মী জীবনবিমা অত্যন্ত জরুরি মনে করলেও মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এর বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে