সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি, চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। যে জিনিস এত দিন এক কোণে অবহেলায় পড়ে থাকত; ছিল না কোনো মান–সম্মান; ভেতরে গ্যাস আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য বাড়ির কর্ত্রী স্টিলের চামচ কিংবা খুন্তি দিয়ে সজোর ‘ঠং ঠং’ করে বাড়ি মারতেন; বেচারা নীরবে–নিভৃতে সেই নির্যাতন সহ্য করে সার্ভিস দিয়ে যেত। সেই জিনিসকে কিনা এখন চুলার তাকের ওপর এমনভাবে সাজিয়ে–গুছিয়ে তুলে রেখেছে যে খুন্তি দূরের কথা, একটা মশাও বসার সাহস পাবে না!
নাশতা খেতে সবাই মিলে বসার পর দেখলাম, আলোচনার হট টপিক এই সিলিন্ডারকে ঘিরেই। আব্বা বলে উঠলেন, ‘যে যা বলবা, বলো। জীবনে কনসিসটেন্সি বজায় থাকলে একদিন সবাই সফলতার চূড়ায় পৌঁছাবেই; যার বাস্তব উদাহরণ এই এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার।’ নিজের জীবনে আসলেই ধারাবাহিকতার বড্ড অভাব, ভাবতে না ভাবতেই অমনি আম্মা তুলনা করে বললেন, ‘যেভাবে ও জীবনযুদ্ধে এগিয়ে গেছে, সবার মুখে মুখে এখন ওর সুনাম; আর তুই? দেখ, অন্তত এই সিলিন্ডার থেকে তোর কিছু শেখা উচিত।’
কোনোরকমে নাশতাটা খেয়ে তাড়াহুড়ো করে রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। গন্তব্য রায়হানের বাসা। বাসার নিচে নামতেই দেখি, গলির মুখে হালকাপাতলা জটলা। ঘটনা কী হয়েছে দেখতে গিয়ে দেখি, এলাকার ফাহিম রয়েল এনফিল্ডের ওপরে বসে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাইকের চাবি ঘোরাচ্ছে আর কালো সানগ্লাস পরে আশপাশে তাকিয়ে মিনমিন সুর দিচ্ছে। আরেব্বাহ! যে বান্দা এত দিন দুচাকার সাইকেল চালাত, সেই বান্দা এখন দুচাকার মোটরসাইকেল চালাচ্ছে! তাও কিনা আবার রয়েল এনফিল্ড! তাকে ঘিরেই উৎসুক এলাকাবাসী জটলা বেঁধেছে
ঘটনা ঘেঁটে জানলাম, ফাহিমের এই চমৎকার সাইকেল টু মোটরসাইকেলের ট্রানজিশনে বড় অবদান রেখেছে এই সিলিন্ডার। ঠিক পাঁচ মাস আগে এক মুরব্বির কাছে গিয়েছিল পরামর্শ নিতে। মুরব্বি তাকে বুদ্ধি দিয়েছিল, ‘দেখো বাবা, মুরব্বিরা যা বলে, তা কিন্তু মন দিয়ে শুনতে হয়। কারণ, সেগুলো সব নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বলা।’ মুরব্বিই তাকে বলেছিল, সিলিন্ডার কিনে স্টক রেখে দিয়ে সুবিধাজনক সময়ে দাম বাড়লেই ছেড়ে দিতে। ফাহিম এক পরামর্শেই আজ লালে লাল! তবে আমার মনে হলো, বেচারার ধৈর্যশক্তি কম। নাহলে সে যদি আরও কিছু মাস অপেক্ষা করত, তাহলে এই সিলিন্ডার বিক্রি করেই সে একেবারে চার চাকার গাড়ি কিনে ফেলতে পারত!
এদিকে রায়হানের বাসায় ঢুকেই আরও একবার চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা! এ তো দেখি সিলিন্ডার নিয়ে রীতিমতো এলাহি কাণ্ড। ড্রয়িংরুমে কাচের বাক্সের ভেতর মখমলে লাল কাপড়ের ওপর শোভা পাচ্ছে ১২ কেজির ঝকঝকা ফকফকা একটি সিলিন্ডার। নিচে লেখা, ‘সতর্কীকরণ: দয়া করে দূর থেকে দেখুন, হাত দেবেন না’। আমার ভ্যাবাচেকা চোখ দেখে রায়হান বলে উঠল, এত মূল্যবান একটা জিনিস তো রান্নাঘরে শোভা পায় না। একদম অরিজিনাল এটা, কোনো ডুপ্লিকেট না। বাসায় মেহমান ঢুকতেই এটা দেখে অবাক হয়। এ যেন এক আভিজাত্যের প্রতীক
সিলিন্ডার যদি কথা বলতে জানত, তাহলে এসব কাণ্ডকারখানা দেখে নিশ্চয়ই বলত
‘হে আমজনতা, যখন ছিল না আমার দাম, বাসত না ভালো কেউ
ভালোবাসা কতটাই না অদ্ভুত;
এখন বেড়েছে যে দাম, দিয়েছ যে ভালোবাসা।’
আর আমি নিজে নিজে বিড়বিড় করতে করতে বলি, হোয়াট আ গ্রেট ট্রানজিশন অব সিলিন্ডার!
গ্যাসের বাড়তি দামে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ আজব দেশে মীনা রসালো Billboard কাকালাপ পাতি-নেতাদের নামতা একটি প্রকল্পের আত্মকাহিনি স্যরি!
